PCOS নিয়ন্ত্রণে ৩ যোগাসন: জানু শীর্ষাসন, নৌকাসন ও গোমুখাসনের উপকারিতা
অনিয়মিত মাসিক, ওজন বাড়ার প্রবণতা, ব্রণ, অতিরিক্ত লোম এবং চুল পড়া—এই ধরনের একাধিক উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দিলে অনেক মহিলার ক্ষেত্রে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা PCOS-এর সম্ভাবনা থাকতে পারে। PCOS একটি হরমোন ও বিপাকীয় সমস্যা, যা শুধু ওজনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। স্বাভাবিক ওজনের মহিলাদেরও PCOS হতে পারে।
PCOS নিয়ন্ত্রণে ওষুধের পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকাতেও PCOS ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে কোনও একটি নির্দিষ্ট ব্যায়াম বা যোগাসনকে সবার জন্য একমাত্র বা সর্বোত্তম চিকিৎসা বলা যায় না।
PCOS আসলে কী?
PCOS বা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম হল একটি হরমোন-সম্পর্কিত অবস্থা। অনেকের ক্ষেত্রে অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে এবং ডিম্বস্ফোটনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর ফলে মাসিক অনিয়মিত হওয়া, ব্রণ, অতিরিক্ত লোম, চুল পড়া এবং গর্ভধারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ইনসুলিন প্রতিরোধ, ওজন বৃদ্ধি বা কোমরের চারপাশে অতিরিক্ত মেদও থাকতে পারে। তবে মনে রাখা জরুরি, PCOS শুধু বেশি ওজনের মানুষের হয় না এবং প্রত্যেকের উপসর্গও একরকম হয় না।
যোগাসন কি PCOS সারিয়ে দিতে পারে?
যোগাসন PCOS-কে একেবারে “নির্মূল” করে দেয়—এমন দাবি করা ঠিক নয়। তবে নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা সামগ্রিক স্বাস্থ্য, শরীরের গঠন, বিপাকীয় স্বাস্থ্য এবং জীবনযাপনের মান উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। ব্যায়াম হিসেবে হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার, শক্তিবর্ধক ব্যায়াম এবং যোগাসন—সবই ব্যক্তির পছন্দ ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী করা যেতে পারে।
যাঁদের জন্য উচ্চ-তীব্রতার ব্যায়াম করা কঠিন, তাঁদের জন্য ধীরে ধীরে যোগাসন শুরু করা একটি ভালো বিকল্প হতে পারে।
PCOS নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ৩টি যোগাসন
১. জানু শীর্ষাসন
জানু শীর্ষাসন একটি বসে করা স্ট্রেচিং আসন। এই আসনে শরীরের পিছনের অংশ, কোমর ও পায়ের পেশিতে টান পড়ে এবং শরীরের নমনীয়তা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
কীভাবে করবেন
- মাটিতে বা যোগা ম্যাটে পা সামনে ছড়িয়ে সোজা হয়ে বসুন।
- একটি পা ভাঁজ করে তার পায়ের পাতা বিপরীত ঊরুর কাছে রাখুন।
- অন্য পাটি সোজা রাখুন।
- ধীরে ধীরে সামনের দিকে ঝুঁকে সোজা থাকা পায়ের দিকে হাত বাড়ান।
- যতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন ততটাই ঝুঁকুন। জোর করে মাথা হাঁটুতে ঠেকানোর চেষ্টা করবেন না।
- স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে নিতে কয়েক সেকেন্ড অবস্থান করুন।
- দুই পাশেই ধীরে ধীরে অনুশীলন করুন।
উপকারিতা: শরীরের নমনীয়তা বাড়াতে এবং নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তার অংশ হিসেবে এই আসন করা যেতে পারে।
২. নৌকাসন
নৌকাসনে শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে পেটের পেশি ও শরীরের বিভিন্ন অংশ সক্রিয় থাকে। এটি একটি তুলনামূলকভাবে চ্যালেঞ্জিং আসন, তাই নতুনরা সহজ ভঙ্গি থেকে শুরু করতে পারেন।
কীভাবে করবেন
- ম্যাটের উপর সোজা হয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ুন।
- হাত শরীরের পাশে রাখুন।
- ধীরে ধীরে মাথা, ঘাড় ও কাঁধ তুলুন।
- একই সময়ে পা মাটি থেকে তুলে শরীরের উপরের অংশের দিকে আনুন।
- সামর্থ্য অনুযায়ী শরীরকে ভারসাম্য রেখে ধরে রাখুন।
- নতুনদের জন্য হাঁটু সামান্য ভাঁজ করে অনুশীলন করা সহজ হতে পারে।
- শ্বাস আটকে রাখবেন না।
মনে রাখবেন: কোমর বা পিঠে ব্যথা থাকলে এই আসন করার আগে প্রশিক্ষকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
৩. গোমুখাসন
গোমুখাসনে পা, কোমর, কাঁধ এবং বাহুর বিভিন্ন অংশে স্ট্রেচ তৈরি হয়। দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করেন এমন মানুষের জন্যও এই আসন শরীরের নমনীয়তা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।
কীভাবে করবেন
- ম্যাটে সোজা হয়ে বসুন।
- একটি পা ভাঁজ করে নিতম্বের পাশে রাখুন।
- অন্য পাটি ভাঁজ করে তার উপর রাখুন, যাতে দুই হাঁটু কাছাকাছি আসে।
- একটি হাত মাথার উপর দিয়ে পিছনে নিন।
- অন্য হাত নিচের দিক থেকে পিছনে নিয়ে দুই হাতের কাছাকাছি আনুন।
- হাত না পৌঁছালে জোর করবেন না; একটি স্ট্র্যাপ বা তোয়ালে ব্যবহার করতে পারেন।
- কয়েক সেকেন্ড স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে আসন থেকে বেরিয়ে আসুন।
- দুই দিকেই অনুশীলন করুন।
সতর্কতা: কাঁধ, হাঁটু বা কোমরে ব্যথা থাকলে নিজের সীমার মধ্যে অনুশীলন করুন।
PCOS নিয়ন্ত্রণে শুধু যোগাসন নয়, জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ
PCOS-এর ক্ষেত্রে নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু একটি যোগাসন করে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রতিদিনের জীবনযাপনে ছোট ছোট পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যা করতে পারেন
- নিয়মিত হাঁটা বা অন্য কোনও পছন্দের শারীরিক কার্যকলাপ করুন।
- দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে থাকা কমান।
- সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খান।
- পর্যাপ্ত ঘুমের চেষ্টা করুন।
- অতিরিক্ত মানসিক চাপ কমানোর উপায় খুঁজুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিন।
আন্তর্জাতিক PCOS নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, শারীরিক কার্যকলাপের ক্ষেত্রে সবার জন্য একই ধরনের ব্যায়াম বাধ্যতামূলক নয়। যে ধরনের কার্যকলাপ নিয়মিত করা সম্ভব এবং দীর্ঘদিন বজায় রাখা যায়, সেটিই ব্যক্তির জন্য বেশি উপযোগী হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
মাসিক দীর্ঘদিন অনিয়মিত হলে, অস্বাভাবিকভাবে বেশি লোম বা ব্রণ দেখা দিলে, অতিরিক্ত চুল পড়লে, দ্রুত ওজন বাড়লে বা গর্ভধারণে সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—PCOS এবং ডিম্বাশয়ের সাধারণ সিস্ট একই জিনিস নয়। তাই আল্ট্রাসাউন্ডে “সিস্ট” দেখা গেলেই নিজে থেকে PCOS ধরে নেওয়া উচিত নয়। সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
শেষ কথা
PCOS একটি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে, কিন্তু সঠিক জীবনযাপন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। নিয়মিত যোগাসন শরীরকে সক্রিয় রাখতে, নমনীয়তা বাড়াতে এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হিসেবে সাহায্য করতে পারে। তবে যোগাসনকে PCOS-এর একমাত্র চিকিৎসা বা “সিস্ট নির্মূলের নিশ্চিত উপায়” হিসেবে দেখা উচিত নয়।
নিজের শরীরের অবস্থা বুঝে ধীরে শুরু করুন, নিয়মিত থাকুন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত যোগশিক্ষকের পরামর্শ নিন।





Post a Comment