সন্তান কি মোবাইল না দেখলে খেতে চায় না? অভ্যাস বদলাতে চেষ্টা করুন এই ৩টি উপায়ে
আজকাল অনেক বাবা-মায়েরই একটি পরিচিত সমস্যা—সন্তানকে খাওয়াতে গেলেই হাতে তুলে দিতে হয় মোবাইল ফোন। ফোনে কার্টুন, ভিডিও বা নানা ধরনের বিনোদন চালিয়ে দিলে শিশু সহজে খাবার খেয়ে নেয়। ফলে প্রথম দিকে বিষয়টি সুবিধাজনক মনে হলেও ধীরে ধীরে শিশুর মনে এমন একটি অভ্যাস তৈরি হতে পারে যে, পর্দা ছাড়া খাবারই যেন খাওয়া সম্ভব নয়।
কিন্তু খাবারের সময় শিশুর মন যদি সম্পূর্ণভাবে মোবাইলের দিকে থাকে, তাহলে সে খাবারের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ কম পায়। খাবারের স্বাদ, গন্ধ ও গঠন অনুভব করা কিংবা নিজের ক্ষুধা ও পেট ভরে যাওয়ার সংকেত বোঝার অভ্যাসও স্বাভাবিকভাবে তৈরি হতে সময় লাগতে পারে।
তাই হঠাৎ করে মোবাইল বন্ধ করে দেওয়ার পরিবর্তে ধীরে ধীরে শিশুর খাবারের সময়টিকে স্ক্রিনমুক্ত ও আনন্দদায়ক করে তোলার চেষ্টা করা যেতে পারে।
কেন খাবারের সময় মোবাইলের প্রতি এত আকর্ষণ তৈরি হয়?
মোবাইলের উজ্জ্বল ছবি, শব্দ এবং কয়েক সেকেন্ড পরপর বদলে যাওয়া দৃশ্য শিশুর স্বাভাবিকভাবেই মনোযোগ আকর্ষণ করে। ভিডিও দেখতে দেখতে শিশু অনেক সময় বুঝতেই পারে না সে কতটা খাবার খাচ্ছে।
ফলে খাবারের সঙ্গে তার নিজের ক্ষুধা বা তৃপ্তির অনুভূতির পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট অভ্যাস জুড়ে যেতে পারে—“ভিডিও চালু হলেই খাব।”
দীর্ঘদিন এইভাবে চলতে থাকলে খাবারের সময় পরিবারের সঙ্গে কথা বলা, নিজের হাতে খাওয়ার চেষ্টা করা কিংবা খাবারকে উপভোগ করার মতো স্বাভাবিক অভিজ্ঞতাগুলিও কমে যেতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে অভিভাবকদের দোষেই এমন হয়েছে। অনেক সময় শিশুকে খাওয়ানোর সুবিধার জন্যই বাবা-মা প্রথমে মোবাইল ব্যবহার করেন। পরে সেটিই অভ্যাসে পরিণত হয়। তাই দুশ্চিন্তা না করে ধীরে ধীরে অভ্যাস পরিবর্তনের চেষ্টা করাই গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর খাবারের সময় স্ক্রিন কমাতে ৩টি সহজ কৌশল
১. খাবারের জন্য নির্দিষ্ট সময় তৈরি করুন
প্রতিদিন দুপুরের খাবার ও রাতের খাবারের জন্য মোটামুটি নির্দিষ্ট সময় রাখার চেষ্টা করুন। খাবারের সময় যতটা সম্ভব নিয়মিত হলে শিশুর দৈনন্দিন রুটিনও ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে।
খাবার সামনে রেখে দীর্ঘক্ষণ শিশুকে জোর করে বসিয়ে রাখার পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাওয়ার পরিবেশ তৈরি করুন। এতে খাবারকে মোবাইল দেখার সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতা ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব হতে পারে।
২. একসঙ্গে বসে খাওয়ার অভ্যাস করুন
শিশুকে একা খাওয়ানোর পরিবর্তে পরিবারের সদস্যরা সম্ভব হলে তার সঙ্গে বসে খাবার খান।
খাওয়ার সময় শিশুর সঙ্গে দিনের ছোটখাটো ঘটনা নিয়ে কথা বলুন। খাবারটি কী, তার স্বাদ কেমন, কোন খাবারটি তার বেশি ভালো লাগছে—এসব নিয়েও কথা বলা যায়।
খাবারের সময় যদি পরিবারের সঙ্গে গল্প ও যোগাযোগের একটি আনন্দের মুহূর্ত হয়ে ওঠে, তাহলে মোবাইলের প্রয়োজনীয়তা ধীরে ধীরে কমতে পারে।
৩. তাড়াহুড়ো না করে ধীরে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন
শিশুকে দ্রুত খাবার শেষ করানোর চেষ্টা না করে ধীরে ধীরে খেতে উৎসাহিত করুন।
খাবারটি দেখতে কেমন, গন্ধ কেমন, স্বাদ কেমন—এসবের প্রতি তার মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়। ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়ার অভ্যাসও তৈরি করা প্রয়োজন।
এটিকে সহজভাবে ‘সচেতনভাবে খাওয়া’ বা Mindful Eating বলা যায়। এর উদ্দেশ্য শিশুকে খাবারের প্রতি মনোযোগী করা—শুধু দ্রুত খাবার শেষ করা নয়।
একদিনেই অভ্যাস বদলাবে না
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, একদিন মোবাইল বন্ধ করলেই শিশু আনন্দের সঙ্গে খেতে শুরু করবে—এমনটা নাও হতে পারে।
হঠাৎ করে ফোন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিলে অনেক শিশু বিরক্ত হতে পারে, কান্নাকাটি করতে পারে বা খাবার খেতে অস্বীকার করতে পারে। তাই ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করুন।
প্রথমে খাবারের সময় ভিডিওর সময় কমানো যেতে পারে। এরপর খাবারের একটি অংশ স্ক্রিন ছাড়া খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। শিশুটি যদি কয়েক মিনিটও ফোন ছাড়া খেতে পারে, সেটিকেও ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখুন।
শিশুকে বকাঝকা বা ভয় দেখিয়ে নয়, বরং নিয়মিত অভ্যাস ও ভালো পরিবেশের মাধ্যমে পরিবর্তন আনাই বেশি কার্যকর হতে পারে।
বাবা-মায়ের জন্য ছোট্ট মনে রাখার কথা
শিশুর খাবারের সময় শুধু পেট ভরানোর সময় নয়। এটি তার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ তৈরি করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।
তাই চেষ্টা করুন—
- খাবারের সময় মোবাইল ও টিভি যতটা সম্ভব দূরে রাখতে।
- পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসে খাওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে।
- শিশুকে নিজের গতিতে খেতে উৎসাহ দিতে।
- খাবার নিয়ে অযথা চাপ বা ভয় তৈরি না করতে।
- একদিনে পরিবর্তন না এলে হতাশ না হতে।
মনে রাখবেন, আজ যদি আপনার সন্তান একবারও মোবাইলের দিকে না তাকিয়ে নিজের খাবারের দিকে মন দিয়ে খায়, সেটিও একটি ছোট সাফল্য। সেই ছোট সাফল্যই ধীরে ধীরে বড় অভ্যাস পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে।
অভিভাবকদের প্রতি আমাদের বার্তা
সন্তানের হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া সবসময় অভিভাবকের অবহেলার ফল নয়। অনেক সময় পরিস্থিতির কারণে সেটিই সহজ সমাধান হয়ে দাঁড়ায়। তাই নিজেকে দোষ না দিয়ে আজ থেকেই ছোট ছোট পরিবর্তনের চেষ্টা করুন।
সন্তানের সুস্থ শরীরের পাশাপাশি সুস্থ অভ্যাসও তার ভবিষ্যৎ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
Disclaimer
Ichapore Swapnapuron Society-এর ওয়েবসাইট ও ব্লগে প্রকাশিত স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশু পরিচর্যা, পুষ্টি, জীবনযাপন ও অন্যান্য সচেতনতামূলক তথ্য শুধুমাত্র সাধারণ জ্ঞান ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়।
এই ব্লগে প্রকাশিত কোনো তথ্যকে চিকিৎসা-পরামর্শ, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা-পদ্ধতি বা কোনো পেশাদার স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। প্রত্যেক মানুষের শারীরিক অবস্থা ও প্রয়োজন আলাদা। তাই কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা, উপসর্গ, ওষুধ, খাদ্যাভ্যাস বা চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যোগ্য চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আমাদের ব্লগে প্রকাশিত তথ্য বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য উৎস, সাধারণ স্বাস্থ্যজ্ঞান এবং সচেতনতামূলক উপকরণের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হতে পারে। তথ্যের যথাসম্ভব নির্ভুলতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হলেও, কোনো তথ্যের সম্পূর্ণতা, নির্ভুলতা বা সর্বশেষ চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকার বিষয়ে Ichapore Swapnapuron Society কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিশ্চয়তা প্রদান করে না।
কোনো পাঠক এই ব্লগের তথ্যের ভিত্তিতে নিজে থেকে ওষুধ শুরু, বন্ধ বা পরিবর্তন করলে কিংবা চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তার দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির। জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে অনলাইন তথ্যের উপর নির্ভর না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল, চিকিৎসক বা জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
এই ওয়েবসাইটে অন্য কোনো ওয়েবসাইট, সংস্থা বা তথ্যসূত্রের উল্লেখ বা লিঙ্ক থাকলে তা শুধুমাত্র তথ্যগত সুবিধার জন্য। সেই সব তৃতীয় পক্ষের ওয়েবসাইটের বিষয়বস্তু বা পরিষেবার জন্য Ichapore Swapnapuron Society দায়ী নয়।

Post a Comment