ম্যালেরিয়ার টিকা: নাম, ডোজ়, খরচ ও প্রতিরোধের উপায়

Malaria vaccination for children, showing vaccine vials, a healthcare worker, mosquito prevention and protection tips.

 বর্ষা শেষ হয়ে আবহাওয়া বদলের সময় মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি নিয়ে অনেকের মনেই উদ্বেগ তৈরি হয়। ডেঙ্গির পাশাপাশি ম্যালেরিয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাঁদের ক্ষেত্রে মশাবাহিত রোগ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে বর্তমানে টিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে দুটি টিকাকে ব্যবহারের সুপারিশ করেছে— R21/Matrix-M এবং RTS,S/AS01। তবে এই টিকাগুলি মূলত ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকার শিশুদের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলি সব বয়সের মানুষের জন্য সাধারণ টিকা নয় এবং টিকা নিলেও ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি সম্পূর্ণ দূর হয় না।

তাহলে ম্যালেরিয়ার টিকা কী, কোন বয়সে দেওয়া হয়, কতগুলি ডোজ় প্রয়োজন এবং ভারতে এই টিকা পাওয়া যায় কি না? ম্যালেরিয়া থেকে বাঁচতে কী কী সতর্কতা নেওয়া উচিত? আসুন, সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক।

ম্যালেরিয়া কী এবং কীভাবে ছড়ায়?

ম্যালেরিয়া একটি পরজীবীঘটিত রোগ। সংক্রমিত স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার কামড়ের মাধ্যমে এই রোগ মানুষের শরীরে ছড়ায়। ম্যালেরিয়ার জন্য একাধিক প্রজাতির পরজীবী দায়ী, যার মধ্যে Plasmodium falciparum এবং Plasmodium vivax উল্লেখযোগ্য।

সংক্রমণের পরে সাধারণত যে উপসর্গগুলি দেখা যেতে পারে, সেগুলি হল—

  1. জ্বর ও কাঁপুনি।

  2. অতিরিক্ত ঘাম হওয়া।

  3. মাথাব্যথা ও শরীর ব্যথা।

  4. দুর্বলতা ও ক্লান্তি।

  5. বমি বমি ভাব বা বমি।

সব রোগীর ক্ষেত্রে একই উপসর্গ দেখা যায় না। ম্যালেরিয়ার সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা করানো জরুরি। বিশেষ করে P. falciparum সংক্রমণ দ্রুত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।

ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে কোন কোন টিকা রয়েছে?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বর্তমানে ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকায় শিশুদের সুরক্ষার জন্য দুটি টিকার সুপারিশ করেছে।

১. R21/Matrix-M টিকা

এই টিকাটি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে। ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া টিকাটি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত।

R21/Matrix-M টিকা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে Plasmodium falciparum পরজীবীর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে সাহায্য করে। এর ফলে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়।

কোন বয়সে দেওয়া হয়?

WHO-র সুপারিশ অনুযায়ী, ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকার শিশুদের প্রায় ৫ মাস বয়স থেকে এই টিকা দেওয়া যেতে পারে।

কতগুলি ডোজ় প্রয়োজন?

সাধারণভাবে চারটি ডোজ়ের সূচি সুপারিশ করা হয়। প্রথম তিনটি ডোজ়ের মধ্যে অন্তত চার সপ্তাহের ব্যবধান থাকে। চতুর্থ ডোজ়টি সাধারণত তৃতীয় ডোজ়ের ৬–১৮ মাস পরে দেওয়া হয়। স্থানীয় টিকাকরণ কর্মসূচি অনুযায়ী সময়সূচিতে কিছু পরিবর্তন হতে পারে।

কিছু এলাকায় ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বেশি থাকলে চতুর্থ ডোজ়ের এক বছর পরে পঞ্চম ডোজ় দেওয়ার কথাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

২. RTS,S/AS01 বা Mosquirix টিকা

Mosquirix নামে পরিচিত RTS,S/AS01 হল ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে WHO-র সুপারিশ পাওয়া প্রথম টিকা। এটি Plasmodium falciparum পরজীবীর বিরুদ্ধে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

এই টিকাটিও মূলত ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকার শিশুদের জন্য তৈরি ও ব্যবহৃত হয়।

কোন বয়সে দেওয়া হয়?

WHO-র কর্মসূচিগত সুপারিশ অনুযায়ী, প্রায় ৫ মাস বয়স থেকে শিশুদের এই টিকা দেওয়া যেতে পারে। নির্দিষ্ট টিকার অনুমোদিত বয়স ও স্থানীয় কর্মসূচির নির্দেশনা মেনে চলা প্রয়োজন।

কতগুলি ডোজ় প্রয়োজন?

সাধারণভাবে চারটি ডোজ় দেওয়া হয়। প্রথম তিনটি ডোজ়ের মধ্যে অন্তত চার সপ্তাহের ব্যবধান রাখা হয়। চতুর্থ ডোজ়টি সাধারণত তৃতীয় ডোজ়ের ৬–১৮ মাস পরে দেওয়া হয়।

R21/Matrix-M এবং RTS,S/AS01—দুটি টিকাই ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তবে কোন টিকা ব্যবহার করা হবে, তা সংশ্লিষ্ট দেশের টিকাকরণ নীতি, সরবরাহ ও স্থানীয় প্রয়োজনের উপর নির্ভর করে।

ম্যালেরিয়ার টিকার দাম কত?

অনেকেরই প্রশ্ন, ম্যালেরিয়ার টিকা নিতে কত টাকা খরচ হবে?

টিকার দাম নির্ভর করে টিকার ধরন, দেশ, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সরকারি বা বেসরকারি কর্মসূচির উপর। আন্তর্জাতিক সহায়তায় কিছু দেশে টিকা সরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে দেওয়া হয়।

তবে ভারতে সাধারণ মানুষের জন্য এই দুই টিকার বর্তমান খুচরো দাম, ইছাপুর বা উত্তর ২৪ পরগনায় টিকা পাওয়ার জায়গা এবং কোনও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে টিকা দেওয়ার খরচ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য, হালনাগাদ তথ্য নিশ্চিত না করে নির্দিষ্ট মূল্য বলা ঠিক হবে না।

সামাজিক মাধ্যমে বা অন্য কোনও প্রতিবেদনে প্রতি ডোজ়ের নির্দিষ্ট দাম দেখলে সেটিকে যাচাই না করে চূড়ান্ত মূল্য বলে ধরে নেবেন না। টিকার প্রাপ্যতা ও খরচ জানতে স্থানীয় স্বাস্থ্য দপ্তর, সরকারি হাসপাতাল অথবা যোগ্য চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

বিশেষভাবে মনে রাখবেন: WHO-র সুপারিশ থাকা মানেই কোনও টিকা ভারতের সব জায়গায় নিয়মিত সরকারি টিকাকরণ কর্মসূচিতে পাওয়া যায়, এমন নয়।

ম্যালেরিয়ার টিকা কি রোগ পুরোপুরি আটকাতে পারে?

না। ম্যালেরিয়ার টিকা রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে, কিন্তু শতভাগ সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয় না। তাই টিকা দেওয়া হলেও মশার কামড় থেকে বাঁচার ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে হবে।

WHO-র তথ্য অনুযায়ী, R21/Matrix-M এবং RTS,S/AS01—দুটি টিকাই পরীক্ষায় ম্যালেরিয়ার ঘটনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখিয়েছে। তবে টিকার কার্যকারিতা পরিস্থিতি ও ব্যবহারের পদ্ধতির উপর নির্ভর করে।

এই কারণেই টিকাকরণকে মশা নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহার করা জরুরি।

টিকা ছাড়াও ম্যালেরিয়া থেকে বাঁচার উপায়

ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে প্রত্যেকের কিছু সাধারণ অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।

১. মশারি ব্যবহার করুন: ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করুন। সম্ভব হলে কীটনাশক-প্রক্রিয়াজাত মশারি ব্যবহার করা যেতে পারে।

২. মশা তাড়ানোর উপায় গ্রহণ করুন: প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করুন এবং শিশুদের ক্ষেত্রে পণ্যের নির্দেশিকা মেনে চলুন।

৩. বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখুন: ফুলের টব, বালতি, ড্রাম, পরিত্যক্ত পাত্র বা অন্য কোথাও জমে থাকা জল নিয়মিত সরিয়ে ফেলুন। মনে রাখবেন, অ্যানোফিলিস মশার প্রজননস্থল পরিবেশভেদে আলাদা হতে পারে।

৪. দরজা-জানালায় জাল লাগান: মশা যাতে ঘরে ঢুকতে না পারে, সে জন্য দরজা-জানালায় মশা প্রতিরোধী জাল ব্যবহার করুন।

৫. জ্বর হলে অবহেলা করবেন না: জ্বর, কাঁপুনি বা অন্য উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রয়োজন হলে ম্যালেরিয়ার পরীক্ষা করান।

৬. নিজে থেকে ওষুধ খাবেন না: ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা পরজীবীর ধরন, রোগীর অবস্থা এবং ওষুধের কার্যকারিতার উপর নির্ভর করে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ক্লোরোকুইন বা অন্য কোনও ম্যালেরিয়ার ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।

ম্যালেরিয়ার নতুন ওষুধ কি আবিষ্কার হয়েছে?

ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা নিয়ে বিভিন্ন দেশে গবেষণা চলছে। তবে কোনও নতুন ওষুধের গবেষণায় সাফল্যের খবর পাওয়া এবং সেই ওষুধ সাধারণ রোগীদের চিকিৎসায় অনুমোদিত হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়।

কোনও নতুন ওষুধের নাম, কার্যকারিতা বা অল্প সময়ে সম্পূর্ণ জীবাণু নির্মূল করার দাবি শুনলে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাবিষয়ক সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করা উচিত। বর্তমানে চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী স্বীকৃত ওষুধ দিয়ে ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা করানোই নিরাপদ পথ।

কখন দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন?

ম্যালেরিয়ার সন্দেহের সঙ্গে যদি শ্বাসকষ্ট, অচেতন হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, অত্যন্ত দুর্বলতা, বিভ্রান্তি বা বারবার বমির মতো গুরুতর লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিন।

শিশুদের জ্বরকে অবহেলা করবেন না। ম্যালেরিয়া সন্দেহ হলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।


স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ঘোষণা (Medical Disclaimer):

এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনও চিকিৎসকের পরামর্শ, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। ম্যালেরিয়ার টিকা, ওষুধ, ডোজ় ও চিকিৎসা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যোগ্য চিকিৎসক অথবা সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিন। টিকার প্রাপ্যতা ও মূল্য পরিবর্তিত হতে পারে। জ্বর বা ম্যালেরিয়ার সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা করান।




কোন মন্তব্য নেই

আপনার মূল্যবান মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকলে মন্তব্যের মাধ্যমে জানান। আপনার মন্তব্য প্রকাশের আগে পর্যালোচনা করা হবে।

Blogger দ্বারা পরিচালিত.